বেড সোর বা শয্যা ক্ষতঃ জানার আছে অনেক কিছুই

পক্ষাঘাত গ্রস্থ রোগী যারা অন্যের সাহায্য ছাড়া নিজেদের হাত পা নড়া চড়া করতে পারে না, বিছানা থেকে উঠতে পারেন না, বা বসতে পারেন না তারা শরীরের পেছনের দিকে কোমরের নিজের অংশে এক ধরণের ক্ষততে আক্রান্ত হতে পারেন যাকে আমরা সাধারণ ভাষায় বেড সোর বা শয্যা ক্ষত নামে অভিহিত করে থাকি। দীর্ঘক্ষন একই অবস্থানে শুয়ে বা বসে থাকার ফলে সে স্থানের অস্থির উপর চাপ পরে, ফলে সে স্থানের চামড়ার রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে চামড়া ধীরে ধীরে নস্ট হয়ে গিয়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। শুধু যে শুয়ে থাকার ফলে এরকম হতে পারে, বিষয়টা তা নয়। দীর্ঘক্ষন একই অবস্থানে বসে থাকলে বসে থাকার স্থানেও একই রকম ক্ষতের সৃষ্টি হতে পারে। কাজেই এ ধরণের ক্ষতকে বেড সোর না বলে প্রেসার সোর বলা উচিত।

প্রেসার সোর কোথায় কোথায় হতে পারেঃ

সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় কোমড়ের নিচের দিকের অংশ বা স্যাক্রাল এরিয়া। এ ছাড়া পেল্ভিস আর থাই বোনের সংযোগ স্থল, নিতম্বের নিচের দিকের অংশ, পায়ের গোড়ালি, মাথার পেছনের দিকে যেখানে ভর দিয়ে আমরা শুয়ে থাকি বেশি প্রেসার সোর হয়ে থাকে। এ ছাড়াও শরীরের অন্যান্য প্রেসার পয়েন্ট যেখানে চামড়া অস্থির খুব কাছাকাছি থাকে এ সমস্ত স্থানে প্রেসার সোর হতে পারে।

প্রেসার সোর কাদের হবার সম্ভবনা বেশিঃ

৪ টি ফ্যাক্টর এ ধরণের ক্ষতের জন্য দায়ী- Pressure বা চাপ, Friction বা ঘর্ষণ, Shear force বা আচমকা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং Moisture বা আদ্রতা।

এছাড়া এ রোগের রিস্ক ফ্যাক্ট্র গুলো হল-

১। প্যারালাইসিস বা প্যারেসিস

২। অপারেশন বা অন্য কোন কারণে বাধ্যতামূলক ভাবে একই অবস্থানে থাকা

৩ । বয়স্ক রোগী বিশেষত যাদের বয়স ৭০ এর বেশি

৪। যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম- যেমন ডায়বেটিক রোগী, এনিমিয়া, অপুস্টিতে ভোগা রোগী

৫। মেরুদন্ডের আঘাতের ফলে শয্যাশায়ি ব্যক্তি

৬। প্রস্রাব বা পায়খানার কোন নিয়ন্ত্রন নেই এ ধরণের রোগী

এ ছাড়াও দীর্ঘ সময় ধরে অপারেশন করা হয়েছে এরকম ব্যক্তির অপারেশন চলাকালীন সময়ে সতর্কতা না নিলে, বা টাইট প্লাস্টার করা হলে, টাইট শু বা বুট একটানা বিরামহীন ভাবে পরে থাকলেও এর সম্ভবনা বেড়ে যায়।

প্রেসার সোরের পর্যায় সমূহঃ

চিকিৎসার সুবিধার্থে প্রেসার সোরকে বিভিন্ন পর্যায় বা স্টেজ এ ভাগ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত অঞ্চলে শুধু মাত্র চামড়ার রঙ পরিবর্তন, ফোস্কা দেখা দেয়। পর্যায়ক্রমে সেখান থেকে ক্ষত তৈরি হয়ে একদম শেষ পর্যায়ে এত গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয় যে চামড়ার নিচের মাংশ, হাড় সব বাইরে বেরিয়ে আসে।

লক্ষন সমুহঃ

প্রাথমিক ভাবে আক্রান্ত অঞ্চলের চামড়ার রঙ পরিবর্তন হয়। আক্রান্ত অঞ্চল লাল হয়ে যায় এবং এ অবস্থা বেশ কিছুদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এরপর অত্র অঞ্চলে ফোস্কা দেখা দিতে পারে। ধীরে ধীরে উপরের চামড়া মরে গিয়ে উঠে যায় এবং ঘা এর সৃষ্টি হয়। এর সাথে রোগীর জ্বর থাকতে পারে।

চিকিতসাঃ

প্রেসার সোর এর চিকিৎসা একদিকে যেমন ব্যয়বহুল অন্যদিকে সময় সাপেক্ষ। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করতে পারলে এ সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সেই সাথে প্রয়োজন আক্রান্ত রোগীর যথাযথ যত্ন নেয়া।

প্রেসার সোর এর লক্ষন দেখা দিলে দ্রুত একজন শল্য চিকিতসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসার পাশাপাশি বাড়িতেও রোগীর অতিরিক্ত যত্ন নিতে হবে যেমন- পুস্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে, মুখে খেতে না পারলে অনেক সময় নাকে নল দিয়েও খাওয়ানোর প্রয়োজন হয়। সেই সাথে শোয়ার জন্য রোগীকে বাতাসে ফোলানো বিছানা বা নিউমেটিক বেড ব্যবহার করতে বলতে হবে এবং প্রতি ২ ঘন্টা পর পর রোগীর অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। যারা হুইল চেয়ারে চলাচল করেন তাদের অবশ্যই প্রতি আধা ঘন্টা পর পর একবার ৫-১০ সেকেন্ড এর জন্য বসা থেকে উঠতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির প্রসাব বা পায়খানা সব সময় পরিস্কার রাখতে হবে, ভেজা কাপর, বিছানা, ডায়াপার ইত্যাদি সাথে সাথে পরিবর্তন করে দিতে হবে। ডায়বেটিস বা অন্যান্য সমস্যা থাকে সেগুলোর নিয়ন্ত্রন করতে হবে।

ক্ষত বেশি হয়ে মাংশ বা হাড় বেরিয়ে গেলে দেরি না করে একজন প্লাস্টিক সার্জনের সাথে পরামর্শ করতে হবে। এভাবে সকলের সম্মিলিত চেস্টায় প্রেসার সোর আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন যাত্রার মান বাড়ানো সম্ভব।

Dr. Mosabbir Ahmad Khan – Expert Plastic Surgeon

ধানমন্ডি ক্লিনিক (প্রাঃ) লিঃ

গ্রীন হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক ল্যাব

Dr. Mosabbir© 2024 Developed by ClixorBD